৩. আল্লাহর মহব্বত।
আল্লাহর মহব্বত প্রতিটি বান্দার কলবে সুপ্ত আছে। কলবের মৌলিক উপাদানের মধ্যেই আল্লাহর মহব্বত নিহিত আছে। আল্লাহর অস্তিত্বে অবিশ^াস বা নাস্তিকতা মানবমনের সুস্থ্য আচরণ নয়, বিকৃতি। আল্লাহর যথাযথ পরিচয় জানা না থাকলে সমস্যা দেখা দেয়। বান্দা আল্লাহর আসমায়ে হুসনা, আল্লাহর স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘সিফাত’ সম্পর্কে যত বেশি জানবে, বান্দার তাকওয়া-পরহেযগারির পরিমাণও তত বৃদ্ধি পেতে থাকবে। আল্লাহর প্রতি মহব্বতও উত্তরোত্তর বাড়তে থাকবে।
আল্লাহকে যতবেশি চিনবে, বান্দার কলবে ততবেশি ‘উবূদিয়্যতের’ উত্তম বৃক্ষ ফলন্ত হতে থাকবে। আল্লাহর মারিফাতসিক্ত কলব থেকে ইবাদতের ফল উদ্গম হতে থাকবে। সমস্ত অনুগ্রহ আর কৃত্বিত্ব একমাত্র আল্লাহরই জন্য, একমাত্র আল্লাহরই পক্ষ হতে, একমাত্র আল্লাহরই জন্য। আলহামদুলিল্লাহ।
৩. আস্তাগফিরুল্লাহ (أَستغفرُ الله)
আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
প্রথমত আমি ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলতে পারছি, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে অনেক বড় অনুগ্রহ। আল্লাহর বিশেষ করুণা ছাড়া, আস্তাগফিরুল্লাহ বলা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আস্তাগফিরুল্লাহ বললেই আামি ক্ষমা পেয়ে যাবো? আমার অবস্থার পরিবর্তন হয়ে যাবে? আমি ক্ষমা পেতে হলে, আল্লাহর সায়, সম্মতি আর সন্তুষ্টি থাকতে হবে। তিনি মান্নান (المنَّان)। মহা অনুগ্রহকারী। তিনিই বান্দার সামনে মুক্তি ও ক্ষমার দরজা খুলে দেন। তিনিই বান্দাকে সামনে বাড়ার উপায় সৃষ্টি করে দেন। তিনিই দয়া করে বান্দার কলবে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ সৃষ্টি করে দেন। তিনি যাকে ভালোবাসেন, তার কলবে সার্বক্ষণিকভাবে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ জারি করে দেন। তিনি যে বান্দাকে পছন্দ করেন, তার জান ও জবানে আস্তাগফিরুল্লাহ চালু করে দেন।
৪. আস্তাগফিরুল্লাহ (أَستغفرُ الله)
আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
বান্দা যখন কায়মনোবাক্যে ইস্তেগফার করে, রহমতের শীতল বাতাস তার কলবের উপর দিয়ে বয়ে যায়। ইস্তেগফার বান্দার মনে আল্লাহর ক্ষমা, অনুগ্রহ, করুণা সম্মান ও প্রভূত কল্যাণের প্রবল আশা জাগিয়ে তোলে। যার জন্য আল্লাহর মাগফিরাতের দরজা খুলে যায়, দুনিয়ার আখেরাতের সীমাহীন কল্যাণ লাভ হয়। আল্লাহ তা‘আলা তাকে বলিষ্ঠ সাহায্য (نصراً عزيزاً) দান করেন।
২. আল্লাহর তাজীম
একজন স্রষ্টা আছেন, এটা প্রতিটি বান্দার বোধের গভীরে রোপণ করা থাকে। সৃষ্টিকর্তার প্রতি সম্মান-সমীহবোধও প্রতিটি বান্দার কলবে জন্মাবধি চারিয়ে দেয়া থাকে। সৃষ্টিকর্তার প্রতি তাজীম মানুষের জন্মগত সহজাত প্রবণতা। আল্লাহর প্রতি কলবের ঝোঁক আর আনতি মানুষের প্রধানতম ও মৌলিক অভ্যেস। পরিবেশ পরিস্থিতির প্রভাবে, আল্লাহর সঠিক পরিচয় জানা থাকে না। বান্দার প্রধানতম কর্তব্য ‘আল্লাহর মারেফাত’ হাসিল করা। আল্লাহকে চেনা ও জানা। আল্লাহর মারেফাত অর্জন হলে, নাফস-প্রবৃত্তি শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচা সহজ হবে। ধ্বংস-বিচ্যুতি-গোমরাহির পথ থেসে দূরে সরে থাকা সহজ হবে। আল্লাহর ডাকে সাড়া দেয়া সহজ হবে। আল্লাহর আনুগত্য ও তাকওয়া অর্জন সহজ হয়ে যাবে। তাহলে,
ক. প্রথমে আল্লাহর মারেফাত।
খ. তারপর আল্লাহর তাজীম।
গ. তারপর আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদত।
ঘ. তারপর গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা।
৩. আল্লাহর তাজীম
বান্দার কলবে কখন আল্লাহর তাজীম-তাওকীর (تعظيم وتوقير) আসবে? আল্লাহর মারেফাত হাসিল হলে। যতবেশি আল্লাহর মারেফাত হাসিল হবে, ততবেশি আল্লাহর
শায়খুল ইসলাম আল্লামা তাকী উসমানী (হাফিযাহুল্লাহ)।
হযরত সত্যিকারের মহব্বত আর দরদ দিয়ে ‘ইনশাদ’ করেছেন।
প্রথম বয়েস আর শেষবয়েসে গাওয়া হামত/নাতগুলো সাধারণত দিলকাশ হয়। প্রথম বয়েসে থাকে নিষ্পাপ গলা। শেষবয়েসে থাকে আল্লাহর তাকওয়ামাখা ভীতকম্পিত গলা।
.
রাব্বে কারীম হযরতকে হায়াতে তাইয়িবাহ তবীলাহ সহীহা দান করুন। আমাদেরও। আমীন।
একটি সুন্নাহকে বাঁচাবো বলে: ৩০৩
ইসমে আজমের দোয়া
-----
১: মানুষের চাওয়ার কোনও শেষ নেই। নিজের চাওয়াকে পাওয়ায় রূপান্তরিত করতে মানুষ নানা উপায়ের আশ্রয় গ্রহণ করে। কেউ অসদুপায় অবলম্বন করে। কেউ সৎপথ অবলম্বন করে। চাহিদা পূরণের সর্বোত্তম মাধ্যম হল দোয়া। দোয়া মুমিনের শ্রেষ্ঠতম হাতিয়ার। দোয়া করার সুন্নত তরীকা আছে। নবীজির শেখানো পদ্ধতিতে দোয়া করলে, দোয়া কবুলের ব্যপারে নিশ্চিত থাকা যায়।
২. নবীজি ইসমে আযম দিয়ে দোয়া করতেন। ইসমে আযম মানে, মহান সত্ত্বার নাম অথবা আল্লাহ তাআলার ‘মহান নাম’। দোয়ার সাথে আল্লাহর নাম লাগিয়ে দিলে, আল্লাহর নামের উসীলা দিয়ে দোয়া করলে, দোয়ার শক্তি আর গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ তাআলার অগণিত নাম আছে। হাদীসে বিশেষ কিছু নামকে ‘ইসমে আযম’ বলে আখ্যা দেয়া হয়েছে। হাদীসের ভাষ্য দ্বারা বোঝা যায়, আল্লাহ তা‘আলা চান, আমরা যেন এসব মহান নামসমূহ দিয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি। আমরা বিভিন্নভাবে আল্লাহর বিশেষ নামগুলো মিশিয়ে দোয়া করলে, আল্লাহ খুশি হন।
৩. আমরা দোয়ায় যতবেশি আল্লাহর প্রশংসা করতে পারি, ততই ভাল। আমাদের প্রশংসা পেলে আল্লাহ ভীষণ খুশি হন। দোয়াতেও বৈচিত্র্য আসে। আনাস রা. হতে বর্ণিত,
دَخَلَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم المَسْجِدَ وَرَجُلٌ قَدْ صَلَّى وَهُوَ يَدْعُو وَيَقُولُ فِي دُعَائِهِ:
নবীজি একদা মসজিদে প্রবেশ করলেন। মসজিদে একলোক সলাত আদায় করে দোয়া করছিল। দোয়াতে লোকটি বলছিল,
اللَّهُمَّ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ المَنَّانُ بَدِيعُ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ ذَا الجَلَالِ وَالإِكْرَامِ.
ইয়া আল্লাহ! আপনি ছাড়া আর কোনও ইলাহ নেই। আপনি মহা অনুগ্রহকারী। আপনি আসমান ও যমীনের সৃষ্টিকারী। আপনি গৌরবময় ও মহানুভব।
فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم: ্রأَتَدْرُونَ بِمَ دَعَا اللَّهَ؟ دَعَا اللَّهَ بِاسْمِهِ الأَعْظَمِ، الَّذِي إِذَا دُعِيَ بِهِ أَجَابَ، وَإِذَا سُئِلَ بِهِ أَعْطَى
নবীজি বললেন, তোমরা কি জানো সে কী দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছে? সে আল্লাহর স্বীয় ইসমে আযম দিয়ে দোয়া করেছে। ইসমে আযম দিয়ে দোয়া করলে, আল্লাহ দোয়া কবুল করেন। কিছু চাওয়া হলে তিনি পূরণ করেন (তিরমিজী ৩৫৪৪)।
৪. আরেক বর্ণনায় লোকটির দোয়ার সূচনা এভাবে,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنَّ لَكَ الْحَمْدَ، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، وَحْدَكَ لَا شَرِيكَ لَكَ، الْمَنَّانُ، بَدِيعُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ، ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ. فَقَالَ: ্রلَقَدْ سَأَلَ اللَّهَ بِاسْمِهِ الْأَعْظَمِ، الَّذِي إِذَا سُئِلَ بِهِ أَعْطَى، وَإِذَا دُعِيَ بِهِ أَجَابَগ্ধ.
ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি, কারণ সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আপনারই প্রাপ্য। আপনি ছাড়া আর কোনও উপাস্য নেই। আপনি এক। আপনার কোনও শরীক নেই। আপনি মান্নান.. (ইবনে মাজাহ ৩৮৫৮)।
৫. উপরোক্ত তিনটি ইসমে আযম ছাড়া আরও চারটি ইসমে আযমের কথাও নবীজি বলে গেছেন,
اسْمُ اللَّهِ الأَعْظَمُ فِي هَاتَيْنِ الآيَتَيْنِ:
আল্লাহর ইসমে আযম এই দুটি আয়াতে আছে,
وَإِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الرَّحْمَنُ الرَّحِيمُ
তোমাদের মাবুদ একই মাবুদ, তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই। তিনি সকলের প্রতি দয়াবান, পরম দয়ালু (বাকারা ১৬৩)।
الم اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ الحَيُّ القَيُّومُ
আল্লাহ তিনিই, যিনি ছাড়া কোন মাবুদ নেই। যিনি চিরঞ্জীব, সমগ্র জগতের নিয়ন্ত্রক (আলে ইমরান ২)।
৬. আরও কয়েকটি নামকে নবীজি ইসমে আযম বলে গেছেন। বুরাইদা রা. বর্ণনা করেছেন,
أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم سَمِعَ رَجُلًا يَقُولُ:
আল্লাহর রাসূল এক ব্যক্তিকে দোয়া করতে শুনলেন,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ أَنِّي أَشْهَدُ أَنَّكَ أَنْتَ اللَّهُ، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، الْأَحَدُ الصَّمَدُ، الَّذِي لَمْ يَلِدْ، وَلَمْ يُولَدْ، وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ.
ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আপনিই আল্লাহ। আপনি ছাড়া আর কোনও উপাস্য নেই। আপনি একক। আপনি সম্পূর্ণরূপে অমুখাপেক্ষী। আপনি এমন সত্ত্বা যিনি কাউকে জন্ম দেননি। নিজেও কারো থেকে জন্ম নেননি। তাঁর কোনও সমকক্ষ নেই।
فَقَالَ: ্রلَقَدْ سَأَلْتَ اللَّهَ بِالِاسْمِ الَّذِي إِذَا سُئِلَ بِهِ أَعْطَى، وَإِذَا دُعِيَ بِهِ أَجَابَগ্ধ.
আল্লাহর রাসূল দোয়াকারীকে বললেন, তুমি আল্লাহর এমন নাম দিয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছ, যে নামগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে চাওয়া হলে, তিনি দিয়ে দেন। এগুলোর উসীলা দিয়ে দোয়া করা হলে, তিনি কবুল করে নেন (আবূ দাউদ ১৪৯৩)।
৭. নবীজি আরও বলেছেন,
اسْمُ اللهِ الْأَعْظَمُ الَّذِي إِذَا دُعِيَ بِهِ أَجَابَ, فِي سُوَرٍ ثَلَاثٍ: الْبَقَرَةِ، وَآلِ عِمْرَانَ, وَطه
আল্লাহর ইসমে আযম এমন, এগুলোর মাধ্যমে দোয়া করা হলে, আল্লাহ দোয়া কবুল করে নেন। ইসমে আযম তিনটি সূরায় আছে-বাকারা, আলে ইমরান আর তোয়াহায় (আবূ উমামা বাহেলী রা.। ইবনে মাজাহ ৩৮৫৬)।
৮. বিশিষ্ট তাবেয়ী কাসেম বিন আবদুর রহমান মনে করেন, এই তিন সূরায় ‘আলহাইয়ুল কাইয়ূম’ ইসমে আযম বারবার আলোচিত হয়েছে (হাকেম ১৮৬৬)।
৯. আল্লাহ তা‘আলার নাম নিতে কষ্ট কিসের? রাব্বে কারীমের নাম জপা মুমিনের সবচেয়ে প্রিয় কাজ। মুমিনের জন্য সবচেয়ে প্রশান্তিকর কাজ হল আল্লাহর নামের যিকির করা। মুনাজাতেও আল্লাহর নাম নিলে মনে বাড়তি প্রশান্তি নেমে আসবে। ফলে মুনাজাতেও বাড়তি মনোযোগ আসবে। দোয়া কবুল তো হবেই। রাব্বে কারীম সুন্নতখানা পালন করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
আল্লাহর মহব্বত!
------
১: আল্লাহর মহব্বত।
আল্লাহর প্রতি মহব্বত রাখা আকীদায়ে তাওহীদের সবচেয়ে বড় দাবি। আল্লাহর মহব্বত তাওহীদের অপরিহার্য অংশ। মৌলিক উপাদান। অনস্বীকার্য মূলনীতি। আল্লাহর প্রতি মহব্বত রাখা কলবের সবচেয়ে বড় ফরজ দায়িত্ব। আল্লাহর মহব্বতের মাধ্যমে বান্দা ঈমানের মিষ্টতা অনুভব করতে পারে। আমল সংশোধন করতে পারে। আল্লাহর মহব্বত উত্তম জীবনের মূলভিত। সুখ-সৌভাগ্যের উৎস। হৃদয়-নয়নজুড়ানিয়া। আল্লাহর মহব্বতহীন ব্যক্তি জীবন্মৃত।
.
২. আল্লাহর মহব্বত।
আল্লাহর মহব্বত মানে কী? আমার যাবতীয় সম্মান-সমীহ, গুরুত্ব-মর্যাদা, তোয়াজ-তাজীম, বিনয়-নম্রতা, আনুগত্য-দাসত্ব, আবেদন-নিবেদন, আত্মসমর্পণ-আত্মনিবেদন একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করার নামই ‘আল্লাহর মহব্বত’। এই মহব্বতই তাওহীদের হাকীকত। রাব্বুল আলামীনের প্রকৃত উবূদিয়্যত-দাসত্ব। আল্লাহর প্রকৃত বান্দা কখনো রাব্বে কারীমের মহব্বতে আর কাউকে শরীক করে না। আল্লাহর প্রতি বিশুদ্ধ মহব্বতই প্রকৃত দ্বীন। আল্লাহর মহব্বতে মুখলিস বান্দাই দ্বীনের প্রকৃত অনুসারী। আল্লাহর মহব্বতে আর কাউকে শরীক করার নামই ‘শিরক’। আল্লাহর প্রতি মহব্বতে অন্য কাউকে শরীককারী ব্যক্তিই ‘মুশরিক’।
.
৩. আল্লাহর মহব্বত।
আল্লাহর মহব্বত প্রতিটি বান্দার কলবে সুপ্ত আছে। কলবের মৌলিক উপাদানের মধ্যেই আল্লাহর মহব্বত নিহিত আছে। আল্লাহর অস্তিত্বে অবিশ্বাস বা নাস্তিকতা মানবমনের সুস্থ্য আচরণ নয়, বিকৃতি। আল্লাহর যথাযথ পরিচয় জানা না থাকলে সমস্যা দেখা দেয়। বান্দা আল্লাহর আসমায়ে হুসনা, আল্লাহর স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘সিফাত’ সম্পর্কে যত বেশি জানবে, বান্দার তাকওয়া-পরহেযগারির পরিমাণও তত বৃদ্ধি পেতে থাকবে। আল্লাহর প্রতি মহব্বতও উত্তরোত্তর বাড়তে থাকবে।
আল্লাহকে যতবেশি চিনবে, বান্দার কলবে ততবেশি ‘উবূদিয়্যতের’ উত্তম বৃক্ষ ফলন্ত হতে থাকবে। আল্লাহর মারিফাতসিক্ত কলব থেকে ইবাদতের ফল উদ্গম হতে থাকবে। সমস্ত অনুগ্রহ আর কৃত্বিত্ব একমাত্র আল্লাহরই জন্য, একমাত্র আল্লাহরই পক্ষ হতে, একমাত্র আল্লাহরই জন্য। আলহামদুলিল্লাহ।
লা হাওলা ওয়ালা কুউয়াতা!
--------------
১: লা- হাওলা ওয়ালা কুউয়াতা ইল্লা- বিল্লা-হ (لا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللّه)।
আল্লাহ ছাড়া কোনও উপায় নেই, কোনও শক্তি নেই।
আমার মুখের ওপর পৃথিবীর যাবতীয় দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও আমি কখনো কিছুতেই নিরাশ হবো না। আমার সমস্ত শক্তি-সামর্থ নিঃশেষ করেও উদ্দিশ্য হাসিলে ব্যর্থ হলে, একটুও আশা হারাব না। কোনও অবস্থাতেই আমি আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হবো না। সর্বাবস্থায় আমি আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ অবিচল আস্থা রাখব। আমি সুনিশ্চিত ইয়াকীন রাখব, যিনি স্বীয় রহমত ও হেকমতে আমার সামনে একটি দরজা বন্ধ করেছেন, তিনি অচিরেই স্বীয় করুণা ও অনুগ্রহ, শক্তি ও সামর্থে আমার জন্য মুক্তির দরজা খুলে দেবেন। ইন শা আল্লাহ।
.
২. লা- হাওলা ওয়ালা কুউয়াতা ইল্লা- বিল্লা-হ (لا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللّه)।
আল্লাহ ছাড়া কোনও উপায় নেই, কোনও শক্তি নেই।
এই দোয়া মাজলুম অসহায়ের হাতিয়ার। এই দোয়া কখন ফলপ্রসূ হবে? দোয়াটির কার্যকারিতা নির্ভর করবে, আমার আকীদায়ে তাওহীদের গভীরতার উপর। দোয়াটি বলার ক্ষেত্রে একীনের উপর। রাব্বে কারীমের প্রতি আমার আনুগত্য আর পুণ্যকর্মের ওপর। আল্লাহর ওয়াদার প্রতি আমার আস্থা পোষণের উপর। আমার ভেতর-বাহিরকে সংশোধন করার উপর। আমার নিয়ত ও অন্তরের স্বচ্চতার উপর। আমার এসব ঠিক থাকলে, আল্লাহ তা‘আলা আমাকে আশাতীত প্রতিদানে ভূষিত করবেন। কল্পনাতীত বিনিময় দান করবেন। ধারণাতীত পুরস্কার দান করবেন।
.
৩. লা- হাওলা ওয়ালা কুউয়াতা ইল্লা- বিল্লা-হ (لا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللّه)।
আল্লাহ ছাড়া কোনও উপায় নেই, কোনও শক্তি নেই।
যে কোনও ইবাদত বিশেষ করে সলাত আদায়ের সর্বোচ্চ স্তর হল (الإِحسان والمُراقبة) ইহসান ও মুরাকাবার পর্যায়ে উপনীত হওয়া। এমনভাবে ইবাদত করা, যেন আমি আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছি। এটা সর্বোচ্চ পর্যায়। এটা সম্ভব না হলে, অন্তত এটুকু মনে করা, আমি তাকে দেখতে না পেলেও তিনি তো আমাকে দেখতে পাচ্ছেন।
আমি সলাত-সিয়ামকে ‘ইহসান-মুরাকাবার’ স্তরে উপনীত করতে চাইলে, আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়। আল্লাহর সাহায্য আর অনুগ্রহ ছাড়া এ-পর্যায়ে পৌঁছা অসম্ভব। যে কোনও ইবাদত শুরুর আগে, মনে মনে জপে নিব- লা হাওলা ওয়ালা কুউয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। সম্পূর্ণ হুজুরে কলব (حُضور القلب) বা জাগ্রত সচেতন মনোযোগে সলাত-সিয়াম-ইবাদতে মশগুল হতে চাইলে আল্লাহর সাহায্যের বিকল্প নেই।
তাকবীরে তাহরীমা থেকে সালাম ফেরানো পর্যন্ত, রব্বের প্রতি পরিপূর্ণ অনুগত বিশ^স্ত হতে চাইলে রব্বের অনুগ্রহ আবশ্যক। দুনিয়াবি অর্জনে যেমন আল্লাহর তাওফীক ও অনুগ্রহ দরকার, রব্বের উদ্দেশ্যে নিবেদিত ইবাদতে পূর্ণমগ্নতা অর্জনও রব্বের করুণা ছাড়া সম্ভব নয়। প্রতিটি ইবাদতের নিয়ত করার সাথে সাথে ‘ইহসান-মুরাকাবার’ স্তর লাভের নিয়্যত ও দোয়াও করা দরকার। আল্লাহর সাহায্য করুণা ছাড়া যে আমার একপা চলাও যে সম্ভব নয়।
আজ থেকে আমার প্রতিটি ইবাদত-সলাত-সিয়াম হোক ইহসান-মুরাকাবার সাথে। রাব্বে কারীমের অনুগ্রহের সাথে।
ইখলাস!
---
১: ইখলাস
ইখলাস মানে একনিষ্ঠতা। আল্লাহর জন্যই সবকিছু করা। ইখলাস দ্বীনের মূলভিত। ইখলাস দ্বীনের প্রকৃত হাকীকত ও প্রাণশক্তি। ঈমানের সংজ্ঞাভুক্ত কলবী আমলের গুরুত্বপূর্ণতম অংশ হল ‘ইখলাস’। মর্যাদা গুরুত্ব ও প্রভাবে দুনিয়া ও আখেরাতের সবচেয়ে প্রভাবশালী আমল। দোয়া করতে গেলে ইখলাস আবশ্যক। ইখলাসবিহীন কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না। ইখলাসহীন ইবাদত জাহান্নাম থেকে মুক্তির উসীলা হতে পারবে না।
.
২. ইখলাস
ইখলাস অর্জন করতে হলে, প্রথমে নিজেকে চিনতে হবে। নাফস সম্পর্কে জানতে হবে। প্রবৃত্তির ঝোঁক-আসক্তি সম্পর্কে পরিপূর্ণ ওয়াকিবহাল থাকতে হবে। তারপর জানতে হবে,
ক. কোনও জিনিস নয় তাঁর অনুরূপ (لَیۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَیۡءࣱۖ) শুরা ১১।
খ. দৃষ্টিসমূহ তাঁকে ধরতে পারে না (لا تُدْرِكُهُ الأَبصارُ)। আন‘আম ১০৩।
গ. অসম্ভব নয় (দয়াময়ের পুত্র আছে, একথা বলা)-র কারণে আকাশ ফেটে যাবে, ভূমি বিদীর্ণ হবে এবং পাহাড় ভেঙে-চুরে পড়বে-মারয়াম ৯০।
تكادُ السمواتُ يتفطَّرنَ منه وتنشقُ الأَرضُ وتخِرُّ الجبالُ هدّاً
এ-বিষয়গুলো ভাল করে আত্মস্থ করে নিলে, আল্লাহর বড়ত্ব বোঝা সহজ হবে। আল্লাহর প্রতি আমার আনুগত্যে নিষ্ঠা সৃষ্টি হবে। ইবাদত-বন্দেগীতে বিশুদ্ধ ইখলাস ফয়দা হবে।
ইয়া আল্লাহ, আমাদের পরিপূর্ণ ইখলাস দান করুন। আমাদের তাওফীক দান করুন। যাবতীয় বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করুন। ভাল কাজে দ্রুত ধাবিত হওয়ার জ¦লন্ত উৎসাহ দান করুন। আমীন।
.