ফুলসজ্জার রাতে এমন একটা কান্ড ঘটে যাবে বুঝতেই পারেনি শাওন। একদিকে ভয় আর অন্যদিকে লজ্জাজনক একটা অস্বস্তিকর ঘটনা আচমকা ঘটে যাবে কল্পনাও করিনি সে। কোন উপায়ান্তর না পেয়ে শাওন তার দুলাভাইকে ফোন দিয়ে বললো-
--দুলাভাই, তন্নী তো বেহুশ হয়ে বিছানায় পড়ে আছে, কি করি এখন?
দুলাভাই হাহা করে হেসে দিলো। টিটকারির স্বরে শাওনকে বললো-
--শালাবাবু কি এমন কান্ড ঘটিয়েছো বলতো শুনি। বাসর ঘরে বউকে একেবারে বেহুস করে ফেলেছো?
এমন সময়ে দুষ্টুমী একেবারে বেমানান,সহ্য হচ্ছিলোনা শাওনের, তাই একটু উচ্চস্বরে রাগান্বিত হয়ে দুলাভাইকে বললো-
--দুলাভাই,ফাইজালামী করবেন না একদম। আমি রুমে ঢুকার পর তন্নীর হাতে একটা কলম দেখলাম। ও শুধু ঘামচ্ছিলো আর টিস্যু দিয়ে চোখমুখ মুছতেছিলো তাছাড়া ও কি বলবে বলবে বলে আকুপাকু করতেছিলো মনে হয়। শেষ পর্যন্ত কিছু না বলেই বিছানায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। আমি বাসরঘরের সব ফুলের ছড়াগুলো ছিঁড়ে একপাশে ফেলে রেখে বিছানাটা খোলামেলা করে রেখেছি আর পাখাটা সর্বোচ্চ গতিতে ছেড়ে দিয়ে ওর পাশে বসে আছি। কিছু একটা করেন প্লিজ।
--বলো কি! ডাক্তার ডাকতে হবে নাকি? আচ্ছা দাঁড়াও, আমি এক্ষুনী আসছি,তুমি দরজাটা খুলে রাখো।
দুলাভাই, শাওনের বড় আপাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলে বাসরঘরে নিয়ে আসলো। বিশ মিনিট ধরে মাথায় পানি ঢাললো আর পায়ের তালু ও হাতের তালুতে রসুন আর সরিষার তেল গরম করে ম্যাসেজ করে তন্নীর হুশ ফিরালো, আর শাওন পাশে ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে নির্বিকারের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তারপর শাওনের দুলাভাই আর আপা, তন্নীকে জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে? খুব অসুস্থ কিনা জানতে চাইলো। তন্নী বললো তার কিছুই হয়নি। বিয়ে বাড়ী, তার উপর কয়েকদিন ধরে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি সব মিলেয়ে বিয়ের ধকলটা সে হজম করতে পারেনি বলে দুলাভাই আর আপাকে বললো।
দুলাভাই আর শাওনের আপা বুঝতে পারছেনা কি বলবে। বাসরঘরে বউকে বাসর বাদ দিয়ে ঘুমাতে বললে শাওনের উপর অন্যায় করা হবে আর ঘুমাতে না বললেও তন্নীর উপর দায়িত্ববোধ দেখানো হবে না। শেষমেশ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে শাওনের দুলাভাই আর তার বোন, তন্নীকে বললো, "তোমরা কথা বলো আমরা যাচ্ছি। আর কোনকিছুর দরকার হলে শাওনকে বলো আমাদের ফোন দিতে।"
.
দুলাভাই আর আপা শাওনকে আর তন্নীকে বাসর ঘরে রেখে চলে যায়। তন্নী উঠে বসলো, বললো-সরি,এমন একটা ব্যাপার হয়ে যাবে বুঝতে পারিনি, আসলে আপনাকে কিছু বলার ছিলো, তখন ভয় হচ্ছিলো বলতে, এখন বলবো? শাওন তন্নীকে চুপ করিয়ে দিয়ে বললো, তন্নী আজ না,অন্যদিন বলো। এমনিতে ক'দিন ধরে বিয়ে নিয়ে একটা বড়সড় ধকল গেলো আর তুমি এইমাত্র অজ্ঞান থেকে হুশে ফিরলে। এক কাজ করো, তুমি ঘুমিয়ে পড়ো। যা বলার আগামীকাল বলো,আমি শুনবো। তন্নী বললো, আচ্ছা আমার হাতে একটা কলম ছিলো। কলমটা কোথায়? শাওন বিছানার একপাশ থেকে কলমটা খুজে এনে তন্নীর হাতে কলমটা দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, এ কলমটা কি খুব দরকার? উত্তরে তন্নী বললো,জ্বী, এটা আমার খুব দরকার।
.
তন্নীকে শুইয়ে দিয়ে শাওন বেলকুনিতে এসে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে রইলো। কিছুক্ষন পর রুমে ঢুকে শোফাতে শুয়ে শাওনও ঘুমিয়ে পড়লো। এমনিতে অনেক ক্লান্তিবোধ হচ্ছে তাছাড়া তন্নীও হুট করে অসুস্থ হয়ে পড়লো।
.
পরেরদিন বৌভাতের আয়োজন করা হলো একটা কমিউনিটি সেন্টারে। শাওনের পরিবার চাচ্ছিলো বৌভাতের অনুষ্ঠানটা যেন তাদের বাসায় হয়। কিন্তু তন্নীর ফ্যামেলির লোকজনের অনুরোধে কমিউনিটি সেন্টারে বৌভাত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বিয়েটাও হয়েছে কমিউনিটি সেন্টারে, তন্নীর পরিবারের লোকজনের অনুরোধেই।
.
বৌভাত অনুষ্ঠানে সময়মত তন্নীর ফ্যামিলির লোকজনও চলে আসলো। শাওনের ফুপি,তন্নী বাবার বাড়ির লোকজন দেখে রেগে গেলেন। শাওনের পরিবার থেকে পাত্রীপক্ষদের দাওয়াত করেছিলো একশজন। অথচ তন্নীর কয়েকজন নিকটাত্মীয় আর পরিবারের সদস্য মিলে পঁচিশ বা ত্রিশ জনের মতো এসেছে বৌভাতে। ব্যাপারটা শাওনের ফুপি কিছুতেই মানতে পারছেনা। এতোগুলো খাবার কি করবে এখন! শাওনের ফুপি গিয়ে আফজাল সাহেব ও রীনা বেগমকে অর্থাৎ শাওনের বাবা-মা'র কাছে গিয়ে জোরে চিৎকার করে বলতে লাগলো, তন্নীর পরিবারের এই কাজটা খুব খারাপ হয়েছে। একশজন দাওয়াতী লোকজন আসার কথা ছিলো, আর আসলো মাত্র ত্রিশজনের মতো। কেন এই কাজটা করলো? আফজাল সাহেব শাওনের ফুপি মহব্বতী বেগমকে কোনপ্রকার ভুলভাল বুঝিয়ে ঠান্ডা করলো। বললো, আপা তুমি এ বাড়ির মেহমান হিসেবেই থাকো। ওরা যা করেছে এটা আমি আর তোমার ভাবী দেখবো। আর এতো জোরে চিল্লালে মেহমানরা শুনে ফেলবে। পরে ব্যাপারটা খারাপ হবে।
.
শাওনের পরিবার ছিলো অনেক ধনী ও অর্থসম্পদশালী, সে কারনেই আসলে শাওনের ফুপির চাওয়া ছিলো শাওনের সাথে যেন তার মেয়ে রেহানার বিয়ে হয়। আর শাওনের মা আর আফজাল সাহেব চায়নি আত্মীয়দের মধ্যে নতুন কোন আত্মীয়ের সম্পর্ক হোক। তাই শাওনের ফুপির মনোবাসনা পূর্ণ না হওয়ার কারনে শাওনের বিয়েতে সবকিছুর ভুলত্রুটি অনেক বড় করে সবার কাছে ছড়াতে চাচ্ছে। আর শাওনের বাবা-মাও ব্যাপারটা বুঝে ফেলেছে। তাই শাওনের ফুপিকে পরিবারের সবাই শুধুমাত্র মেহমান হিসেবেই দেখছে। শাওনের অভিভাবক হিসেবে কেউ পাত্তা দিচ্ছেনা।
.
শাওন এগিয়ে গিয়ে তার শশুর আব্বার সামনে বসে পা ছুঁয়ে সালাম করলো। শশুরআব্বা এদিকওদিক তাকিয়ে শাওনকে ডেকে একটা পাশে নিয়ে বললেন-
--শাওন বাবা, তোমাকে একটা কথা বলার ছিলো।
শশুর আব্বার কথা এমন কথা শুনে শাওন কিছুটা ভয় পেলো। তার ফুপি মেহমান কম আসার জন্য যে চিল্লাচিল্লি করেছিলো এগুলো শুনে ফেলেছে কিনা,তাই ভাবছে। শাওন তার শশুর আব্বাকে বললো,
--জ্বী আব্বা,বলুন।
--আসলে ব্যাপারটা কিভাবে নিবে বুঝতে পারছিনা। আসলে কথাটা হচ্ছে....
বলতেই দূর থেকে শাওনের মায়ের ডাকের আওয়াজ শুনতে পেলো সে। শাওন তার শশুর আব্বাকে বললো, আমি একটু আসছি। এসেই শুনছি।
শাওন তার মায়ের কাছে গেলো। কি একটা কাজের জন্য বাইরে পাঠালো, পরে আর খেয়ালই হল না, শশুর আব্বা যে শাওনকে কিছু বলতে চেয়েছিলেন।
.
বৌভাত শেষ হয়ে গেলো। দু'দিন পর বাসা থেকে সিদ্ধান্ত হলো একসপ্তাহের হানিমুনে পাঠাবে শুধুমাত্র শাওনকে আর তন্নীকে। আর এই একসপ্তাহে পরিচিত কারো সাথে যোগাযোগ রাখা যাবেনা। মোবাইল ফোন বন্ধ রাখতে হবে,যাতে করে শাওন আর তন্নী দুজনেই হানিমুনের পুরো একটা সপ্তাহ পুরোপুরিভাবে উপভোগ করতে পারে।
.
হানিমুনে তন্নীকে নিয়ে কক্সবাজারের "হোটেল সি প্যালেস"-এ উঠে পড়লো শাওন। রাতে সমুদ্রের ঢেউ দেখতে না পেলেও মাঝরাতে ঢেউওয়ের আওয়াজ হোটেলটার বেলকুনি থেকে শুনতে পাওয়া যায়। বেলকুনিতে দাঁড়িয়ে আছে শাওন। তন্নী নাইটি পড়ে শাওনের পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললো-
--এইযে শুনুন,আপনাকে কিছু কথা বলার ছিলো।
--অহ হ্যা, কি বলো।
--আমার একটা কালো অতীত আছে। এটা শেয়ার না করা পর্যন্ত কোনভাবেই আপনার সাথে ম্যাচ করতে পারছিনা। আসলে....
.
তন্নীকে থামিয়ে দিয়ে শাওন বললোঃ
--দ্যাখো তন্নী, হানিমুনে এসেছি এই সময়টাকে উপভোগ করার জন্যে। কালো অতীত নিয়ে কথা বলে মন খারাপ করতে চাই না। থাকুক তোমার কালো অতীত, যদি সে অতীতটা ভুলে যেতে পারো তবে ভালো হবে,সুখে থাকবে। অতীতকে টেনে এনে বর্তমানটাকে নষ্ট করো না। শোন, আমাদের এরেঞ্জ ম্যারেজ হয়েছে। তাই এখন হানিমুনের এই সময়টাতে আমরা একে অপরকে পুরোপুরি সময় দিতে না পারলে নিজেদের মধ্যে ভালো একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং হবে না। এই সময়টাতে একে অপরকে চিনতে হবে,বুঝতে হবে। নিজেদের মধ্যে ভালো একটা বোঝাপড়া হওয়ার দরকার। তাই বলছি,অতীতটাকে ভুলে যাও।
--এরেঞ্জ ম্যারেজ হলেও, বিয়ের দিনতারিখ ঠিক হওয়ার পর আপনাকে ফোন দিয়েছিলাম কথা বলার জন্য। অথচ আপনি একই কাজ করলেন। বললেন, এরেঞ্জ ম্যারেজ মানে দুটো অপরিচিত মানুষের একটা অদ্ভুত বন্ধন। আলাদা একটা অনুভুতি। তাই বিয়ের আগে ফোনেও কথা বলবেন না বলে ফোনটা রেখে দিয়েছিলেন। তখনও আমি সে কথাটা বলতে পারিনি। অথচ আমাদের বিয়ের আগে কথাটা বলার উচিত ছিলো।
শাওন তন্নীকে আশ্বস্ত করে বললোঃ
-- আচ্ছা ঠিক আছে। হানিমুনটা শেষ হোক। বাড়িতে ফিরে যাওয়ার পর তোমার অতীত সম্পর্কে বলো। বিয়ের আগে যদি তোমার কারো সাথে রিলেশন থাকে বা ছিলো এমন সব কিছুই মেনে নিবো। অথবা তুমি যা চাইবে তাই হবে। তোমার অতীতটা না শোনা পর্যন্ত আমি তোমার সাথে কোন প্রকার শারিরিক সম্পর্ক করবো না বা চেষ্টাও করবো না। ঠিক আছে?
তন্নী মাথানিচু করে হালকা একটা মুচকী হাসি দিয়ে বললো, আচ্ছা ঠিক আছে।
বিয়ের পর এই প্রথম শাওন তন্নীর মুখে অস্পষ্ট একটা মুচকি হাসি দেখতে পেলো, শাওন বললো- নাইটি চেঞ্জ করে শাড়িটা পড়ো। মাঝরাত,খালি পায়ে দুজন সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ গুনে আসি। আছড়ে পড়া সমদ্রের ঢেউয়ে পা ভিজিয়ে আসি…
চলবে...
গল্প- #কলঙ্কিনী
#পর্ব:- ০১
-#লেখা_আবির_আহমেদ