দিন বদলাচ্ছে ফ্রিল্যান্সারদের
***********************************************************************
বয়স বড়জোর ২৩-২৪। পরিপাটি ঝকঝকে চেহারা। গায়ে বিশ্বখ্যাত কোনো ব্র্যান্ডের শার্ট-জিনস, পায়ে নামী ব্র্যান্ডের কেডস, কাঁধের ব্যাগে ল্যাপটপ-অ্যাপলের ম্যাকবুক। এর সবই নিজের আয়ে কেনা। এই বয়সে যাঁর লেখাপড়া শেষ দিকে থাকার কথা বা চাকরি খোঁজার কথা, তিনি কীভাবে এমন স্বাবলম্বী জীবনযাপন করছেন? এই তরুণ হচ্ছেন ফ্রিল্যান্সার। এখন তাঁর মতো অনেক তরুণ দেশে বসে ডলারে আয় করেন। অনেকের মাসিক আয় হাজার ডলার বা তার বেশি।
ফ্রিল্যান্সারের বাংলা করা যায় মুক্ত পেশাজীবী। নয়টা-পাঁচটা চাকরির ঘেরাটোপে আবদ্ধ নন তাঁরা। বাসা কিংবা যেকোনো স্থানে বসেই কাজ করতে পারেন। লাগবে নিজের দক্ষতা, বিদ্যুৎ আর গতিশীল ইন্টারনেট-সংযোগ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠান স্থানীয় কর্মী নিলে খরচ বেশি হয়। অনেক সময় চাহিদামতো এত কর্মী পাওয়া যায় না।
তারা তখন বাইরে থেকে (আউটসোর্সিং) নির্দিষ্ট কাজটি করিয়ে নেন। এতে ওই প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির যেমন অর্থ সাশ্রয় হয়, তেমনি যেকোনো স্থান থেকে কাজটি করে ওই ব্যক্তিও আয় করেন। বেশির ভাগ কাজ মেলে নির্দিষ্ট কিছু ওয়েবসাইটে। তথ্যপ্রযুক্তির ভাষায় এগুলো ‘অনলাইন মার্কেটপ্লেস’ (অনলাইন কাজের বাজার)। দেশে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার ও সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগে ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রতি তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে।
সফটওয়্যার তৈরির প্রতিষ্ঠান টেকনোবিডির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ ইমরাউল কায়ীশ একসময়ের সফল ফ্রিল্যান্সার। তিনি বলেন, ২০০৫-০৬ সাল থেকে মূলত দেশে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ আসা শুরু হয়। তরুণেরাই এ কাজে অগ্রণী। ফ্রিল্যান্সিংকে জনপ্রিয় করতে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের ‘বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ড’-এর অবদান রয়েছে।
ফ্রিল্যান্সিংয়ে লাখো তরুণ, আয় কত
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্মেদ জানালেন, দেশে এখন সাড়ে ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন। তাঁদের সব মিলিয়ে বার্ষিক আয় প্রায় ১০০ কোটি ডলার বা ১০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা (ডলার ১০৬ টাকা ধরে)। ২০১৪ সাল থেকে লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রকল্পের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৫৩ হাজার তরুণকে তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
তবে বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সার ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান তানজিবা রহমান বলেন, সাড়ে ছয় লাখের হিসাবটা আপওয়ার্ক মার্কেটপ্লেস ধরে। বাংলাদেশ থেকে ১৫৩টি মার্কেটপ্লেসে কাজ করা হয়। সেগুলো হিসাব করলে এই সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। এর ৫৫ শতাংশেরই বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছর। তবে ফ্রিল্যান্সিংয়ে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো কম।
তানজিবা রহমান বলছেন, ফ্রিল্যান্সিংয়ে সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষে ভারত। এরপরই বাংলাদেশের অবস্থান। তবে আয়ের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
তানজিবা রহমান বলেন, ২০২০ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার ফ্রিল্যান্সারকে স্মার্ট কার্ড দেওয়া হয়েছে। এসব কার্ডধারী ব্যাংকঋণ সুবিধা পাবেন। ব্যাংকের মাধ্যমে বাইরে থেকে আয়ের অর্থ আনলে ৪ শতাংশ প্রণোদনাও দেওয়া হচ্ছে।
সামাজিক দায়িত্বও পালন করেন
ফ্রিল্যান্সারদের কাজকর্মে একটা বিষয় চোখে পড়ে। একা একা শুরু করে যখন সফল হন, তিনি আশপাশের তরুণদের সম্পৃক্ত করেন এই কাজে। তাঁদের আয়ের পথ তৈরি করে দেন।
টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার গারো তরুণ সুবীর নকরেক সেই বনাঞ্চল থেকেই ফ্রিল্যান্সিং করে সফল হয়েছেন। এরপর তিনি আইটি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে আশপাশের গারো তরুণদের শিখিয়েছেন। সব জাতিগোষ্ঠীর প্রায় ৫০ হাজার তরুণকে ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন।
আবার কওমি মাদ্রাসার ডিগ্রিধারী শেরপুরের মিনহাজ নিজে সফল হয়ে মাদ্রাসার ৭০০ ছাত্রকে ফ্রিল্যান্সিং শিখিয়েছেন। ক্যানসারে আক্রান্ত বাবাকে বাঁচাতে ত্রিমাত্রিক গ্রাফিকস ও অ্যানিমেশন শিখে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেছিলেন ঢাকার শুভ সরকার। এখন তাঁর বাবা সুস্থ আর তিনি সফল ফ্রিল্যান্সার।
Source: প্রথম আলো