দাঁড়িয়ে থাকার সাধনা: এক অবিশ্বাস্য ত্যাগের গল্প
প্রায় ১২ বছর ধরে তিনি একবারের জন্যও বসেননি।
একবারও না।
বিশ্রামের জন্য নয়।
ঘুমের জন্য নয়।
এমনকি একটি মুহূর্তের জন্যও নয়।
তাঁর নাম দুলাল গিরি জি মহারাজ। তিনি একজন হিন্দু সাধু, যিনি "খাড়েশ্বর বাবা" (Standing Babas) নামে পরিচিত একটি বিরল আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অনুসারী। হিন্দু বৈরাগ্যবাদের কিছু বিশেষ শাখায়, ভক্তরা আত্মসংযমের চরম কিছু পথ বেছে নেন—যা 'তপস্যা' নামে পরিচিত। এই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সাধনার উদ্দেশ্য হলো ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং জাগতিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি বৈরাগ্য প্রদর্শন করা।
দুলাল গিরির কাছে সেই তপস্যার ব্রত ছিল একটিই:
সবসময় দাঁড়িয়ে থাকা। দিনের পর দিন। বছরের পর বছর।
রাতে তিনি শুয়ে পড়েন না। এর পরিবর্তে, তিনি দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই ঘুমান; এ সময় ঝুলন্ত দোলনার মতো একটি কাঠামো তাঁকে কিছুটা ভারসাম্য দেয়, যাতে তাঁর ব্রত ভঙ্গ না করেই শরীর কিছুটা বিশ্রাম পেতে পারে।
বহু বছর ধরে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার ফলে তাঁর শরীরে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে:
পা ফুলে গেছে।
দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়েছে।
পায়ে আলসার বা ঘা দেখা দিয়েছে।
বছরের পর বছর দাঁড়িয়ে থাকার কারণে স্থায়ী শারীরিক ক্ষতি হয়েছে।
সংক্রমণ রোধ করতে স্বেচ্ছাসেবীরা নিয়মিত তাঁর ক্ষতগুলো পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দেন। তবুও তিনি তাঁর সাধনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর পরিচিতদের মতে—তিনি প্রতিজ্ঞা করেছেন যে, হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রধান দেবতা ভগবান শিবের দর্শন না পাওয়া পর্যন্ত তিনি এই সাধনা চালিয়ে যাবেন।
অমর ভারতী: অপর এক অবিচল সাধক
তবে এই ধরনের কঠিন ব্রতধারী তিনি একাই নন। অমর ভারতী নামের আরেকজন সুপরিচিত সাধু সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রতিজ্ঞার কারণে বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন।
১৯৭৩ সালে, শিবের প্রতি নিজের জীবন উৎসর্গ করার পর তিনি তাঁর ডান হাতটি বাতাসের দিকে উঁচিয়ে ধরেন। এরপর তিনি আর কখনোই সেই হাত নিচে নামাননি। দশকের পর দশক ধরে হাতটি ওভাবে থাকার কারণে সেটি শুকিয়ে অকেজো হয়ে যায়, হাড়ের জোড়গুলো স্থায়ীভাবে জমে যায় এবং হাতের নখগুলো লম্বা হয়ে পেঁচিয়ে যায়।
ভক্তি বনাম চরম বাস্তবতা
বহিরাগত বা সাধারণ দর্শকদের কাছে এই ধরনের সাধনা ও অনুশীলন বোঝা অসম্ভব মনে হতে পারে।
কেউ কেউ এর মধ্যে গভীর বিশ্বাস দেখতে পান।
কেউ দেখেন আত্মত্যাগ।
কেউ একে দেখেন চরম পর্যায়ের ভক্তি হিসেবে।
আবার অনেকে প্রশ্ন তোলেন, এই ধরনের আত্মপীড়নমূলক কষ্টের কোনো আধ্যাত্মিক তাৎপর্য আদেও আছে কিনা।
তবে দৃষ্টিভঙ্গি যা-ই হোক না কেন, এই সাধকেরা বহু শতাব্দী ধরে চলে আসা একটি প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করছেন—যে ঐতিহ্যটি গড়ে উঠেছে এই বিশ্বাসের ওপর যে, চরম আত্মত্যাগের মাধ্যমেই কেবল আধ্যাত্মিক উন্নতি সম্ভব।
অর্থ, উদ্দেশ্য এবং বিশ্বাসের খোঁজে মানুষ কত দূর পর্যন্ত যেতে পারে, তা আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তোলে এই সাধকদের জীবনকাহিনী। তাঁদের এই সাধনাকে কেউ প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখতে পারেন, কেউ কৌতূহল নিয়ে, আবার কেউবা সংশয় নিয়ে; তবে একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই:
মানুষের ভেতরের সংকল্প ও প্রতিজ্ঞার ক্ষমতা সত্যিই স্তম্ভিত করার মতো।
ইসলামী আকিদাহ: জ্বীন ও মানুষের শারীরিক সম্পর্ক ও এর প্রতিকার
ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষের মতোই জ্বীন জাতির মধ্যেও পুরুষ ও নারীর ভেদাভেদ রয়েছে। মানুষের সাথে তাদের শারীরিক সম্পর্ক বা মিলনের সম্ভাব্যতা নিয়ে উলামায়ে কেরামের মাঝে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। নিচে এর একটি তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:
১. মানুষের সাথে জ্বীনের মিলন কি সম্ভব? (আলেমদের মতামত)
এই বিষয়ে ইসলামি স্কলারদের মধ্যে মূলত দুটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়:
যাঁরা অসম্ভব মনে করেন: কিছু আলেম মনে করেন, জ্বীন ও মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি উপাদানে (আগুন ও মাটি) তৈরি এবং ভিন্ন জগতের বাসিন্দা। তাই তাদের মধ্যে এমন শারীরিক সম্পর্ক হওয়া প্রকৃতিগতভাবেই অসম্ভব।
যাঁরা সম্ভব মনে করেন (অধিকাংশের মত): জমহুর বা অধিকাংশ মুফাসসির ও ফকীহগণের মতে, জ্বীন ও মানুষের মধ্যে এই ধরনের সম্পর্ক হওয়া সম্ভব। তারা কুরআন, হাদিস এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে একে সত্য বলে গণ্য করেন।
২. কুরআন ও হাদিসের দলীল
বিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা জান্নাতের রমণীদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন:
فِيهِنَّ قَاصِرَاتُ الطَّرْفِ لَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانٌّ
"তথায় (জান্নাতে) থাকবে আয়ত নয়না রমণীগণ, কোনো মানুষ বা জ্বীন ইতিপূর্বে যাদের ব্যবহার (স্পর্শ) করেনি।" (সূরা আর-রহমান: ৫৬)
তাফসীরকারকদের ব্যাখ্যা: ইমাম বাগাভী, ইমাম খাযেন এবং ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ.) সহ অনেক মুফাসসির এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন— আয়াতের ধরণই প্রমাণ করে যে, মানুষের মতো জ্বীনদেরও সহবাসের সক্ষমতা রয়েছে।
হাদিসের নির্দেশনা:
রাসূলুল্লাহ (সা.) স্ত্রী সহবাসের পূর্বে এই দোয়াটি পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন:
"বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা জান্নিবনিশ শায়ত্বানা ওয়া জান্নিবিশ শায়ত্বানা মা রাযাক্বতানা।" (সহীহ বুখারী)
উলামায়ে কেরামের বিশ্লেষণ: এই দোয়ার বিধান দেওয়ার অন্যতম কারণ হলো, মানুষ যাতে শয়তানের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে পারে। দোয়া না পড়লে শয়তান বা জ্বীন সেই মিলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়।
৩. শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহ.)-এর অভিমত
বিখ্যাত সৌদি ফকীহ শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহ.) তাঁর 'লিক্বাউল বাবিল মাফতুহ' গ্রন্থে স্পষ্ট করে বলেছেন:
"আলেমগণ বলেন যে, এটি (জ্বীন-মানুষের মিলন) সম্ভব। কোনো পুরুষ জ্বীন কোনো নারীর সাথে সহবাস করতে পারে এবং নারীটি তা (জাগ্রত বা সুপ্ত অবস্থায়) অনুভবও করতে পারে।"
৪. মিলন যেভাবে ঘটে: লক্ষণ ও অবস্থা
রুকাইয়াহ (শরয়ী ঝাড়ফুঁক) বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, কোনো জ্বীন মানুষের প্রেমে পড়লে (যাকে 'জ্বীনে আশিক' বলা হয়) সে মূলত দুইভাবে ক্ষতি করার চেষ্টা করে:
ঘুমন্ত অবস্থায়: এটি সবচেয়ে বেশি ঘটে। আক্রান্ত ব্যক্তি স্বপ্নের মধ্যে তীব্র শারীরিক মিলনের অভিজ্ঞতা লাভ করেন, যা সাধারণ স্বপ্নদোষের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব মনে হয়। অনেক সময় শরীর অবশ হয়ে থাকে (যাকে সাধারণ ভাষায় বোবায় ধরা বলে) এবং কেউ পাশে আছে এমন উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।
জাগ্রত অবস্থায়: বিরল হলেও এটি ঘটে থাকে। আক্রান্ত ব্যক্তি হুট করে শরীর অবশ বা প্যারালাইজড অনুভব করেন। মিলনের সময় যৌনাঙ্গে বা শরীরে অস্বাভাবিক গরম বাতাসের মতো অনুভূতি হতে পারে, যা ব্যক্তিকে চরমভাবে দুর্বল করে দেয়।
৫. আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক লক্ষণযদি কোনো ব্যক্তি (নারী বা পুরুষ) নিয়মিত এই ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে যান, তবে তাঁর মধ্যে কিছু স্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়:লক্ষণের ধরণসুনির্দিষ্ট লক্ষণসমূহশারীরিক চিহ্নঘুম থেকে ওঠার পর শরীরে (বিশেষ করে গলা, বুক বা উরুর আশেপাশে) রহস্যময় নীল বা লালচে দাগ, খামচি বা কামড়ের চিহ্ন থাকা।তীব্র ক্লান্তিঘুম থেকে ওঠার পর প্রচণ্ড শরীর ব্যথা, অলসতা এবং চরম অবসাদ অনুভব করা।মানসিক পরিবর্তনমেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, একা থাকার প্রবণতা বৃদ্ধি, খাবারে অনিহা এবং ইবাদত-বন্দেগীতে মন না বসা।স্মৃতিশক্তি হ্রাসদিন দিন স্মরণশক্তি ও মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা দ্রুত লোপ পাওয়া।
৬. প্রতিকার ও সুরক্ষার উপায়
এই ধরনের সমস্যা থেকে বাঁচতে হলে একজন মুসলিমকে দৈনন্দিন জীবনে ইসলামি অনুশাসন ও সুন্নতি আমলের প্রতি যত্নবান হতে হবে:
নিয়মিত মাসনুন আমল: প্রতি ফরয নামাযের পর, সকালে ও সন্ধ্যায় এবং ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসী, সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাস (৩ কুল) পড়ে সমস্ত শরীরে ফুঁ দেওয়া।
ঘুমানোর পূর্বের সুন্নাত: ওজুসহকারে ঘুমানো এবং বিছানা ভালোভাবে ঝেড়ে নিয়ে শোয়ার দোয়া পাঠ করা।
গুনাহ বর্জন: ঘরকে গান-বাজনা, অশ্লীল ছবি ও বেপর্দাপনা মুক্ত রাখা, কারণ এগুলো শয়তানকে আকৃষ্ট করে।
জিকির ও নামায: পাঁচ ওয়াক্ত নামায জামায়াতের সাথে (পুরুষদের জন্য) আদায় করা এবং সবসময় ওজু অবস্থায় থাকার চেষ্টা করা।
শরয়ী রুকাইয়াহ: সমস্যা যদি প্রকট আকার ধারণ করে, তবে কোনো বেদাত বা শিরকমুক্ত, অভিজ্ঞ আলেম বা মুত্তাকী রাকী (ঝাড়ফুঁককারী) দ্বারা নিয়মিত শরয়ী রুকাইয়াহ করানো উচিত।
দাঁড়িয়ে থাকার সাধনা: এক অবিশ্বাস্য ত্যাগের গল্প
প্রায় ১২ বছর ধরে তিনি একবারের জন্যও বসেননি।
একবারও না।
বিশ্রামের জন্য নয়।
ঘুমের জন্য নয়।
এমনকি একটি মুহূর্তের জন্যও নয়।
তাঁর নাম দুলাল গিরি জি মহারাজ। তিনি একজন হিন্দু সাধু, যিনি "খাড়েশ্বর বাবা" (Standing Babas) নামে পরিচিত একটি বিরল আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অনুসারী। হিন্দু বৈরাগ্যবাদের কিছু বিশেষ শাখায়, ভক্তরা আত্মসংযমের চরম কিছু পথ বেছে নেন—যা 'তপস্যা' নামে পরিচিত। এই স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সাধনার উদ্দেশ্য হলো ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং জাগতিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি বৈরাগ্য প্রদর্শন করা।
দুলাল গিরির কাছে সেই তপস্যার ব্রত ছিল একটিই:
সবসময় দাঁড়িয়ে থাকা। দিনের পর দিন। বছরের পর বছর।
রাতে তিনি শুয়ে পড়েন না। এর পরিবর্তে, তিনি দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই ঘুমান; এ সময় ঝুলন্ত দোলনার মতো একটি কাঠামো তাঁকে কিছুটা ভারসাম্য দেয়, যাতে তাঁর ব্রত ভঙ্গ না করেই শরীর কিছুটা বিশ্রাম পেতে পারে।
বহু বছর ধরে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার ফলে তাঁর শরীরে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে:
পা ফুলে গেছে।
দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়েছে।
পায়ে আলসার বা ঘা দেখা দিয়েছে।
বছরের পর বছর দাঁড়িয়ে থাকার কারণে স্থায়ী শারীরিক ক্ষতি হয়েছে।
সংক্রমণ রোধ করতে স্বেচ্ছাসেবীরা নিয়মিত তাঁর ক্ষতগুলো পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দেন। তবুও তিনি তাঁর সাধনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর পরিচিতদের মতে—তিনি প্রতিজ্ঞা করেছেন যে, হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রধান দেবতা ভগবান শিবের দর্শন না পাওয়া পর্যন্ত তিনি এই সাধনা চালিয়ে যাবেন।
অমর ভারতী: অপর এক অবিচল সাধক
তবে এই ধরনের কঠিন ব্রতধারী তিনি একাই নন। অমর ভারতী নামের আরেকজন সুপরিচিত সাধু সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রতিজ্ঞার কারণে বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন।
১৯৭৩ সালে, শিবের প্রতি নিজের জীবন উৎসর্গ করার পর তিনি তাঁর ডান হাতটি বাতাসের দিকে উঁচিয়ে ধরেন। এরপর তিনি আর কখনোই সেই হাত নিচে নামাননি। দশকের পর দশক ধরে হাতটি ওভাবে থাকার কারণে সেটি শুকিয়ে অকেজো হয়ে যায়, হাড়ের জোড়গুলো স্থায়ীভাবে জমে যায় এবং হাতের নখগুলো লম্বা হয়ে পেঁচিয়ে যায়।
ভক্তি বনাম চরম বাস্তবতা
বহিরাগত বা সাধারণ দর্শকদের কাছে এই ধরনের সাধনা ও অনুশীলন বোঝা অসম্ভব মনে হতে পারে।
কেউ কেউ এর মধ্যে গভীর বিশ্বাস দেখতে পান।
কেউ দেখেন আত্মত্যাগ।
কেউ একে দেখেন চরম পর্যায়ের ভক্তি হিসেবে।
আবার অনেকে প্রশ্ন তোলেন, এই ধরনের আত্মপীড়নমূলক কষ্টের কোনো আধ্যাত্মিক তাৎপর্য আদেও আছে কিনা।
তবে দৃষ্টিভঙ্গি যা-ই হোক না কেন, এই সাধকেরা বহু শতাব্দী ধরে চলে আসা একটি প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করছেন—যে ঐতিহ্যটি গড়ে উঠেছে এই বিশ্বাসের ওপর যে, চরম আত্মত্যাগের মাধ্যমেই কেবল আধ্যাত্মিক উন্নতি সম্ভব।
অর্থ, উদ্দেশ্য এবং বিশ্বাসের খোঁজে মানুষ কত দূর পর্যন্ত যেতে পারে, তা আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তোলে এই সাধকদের জীবনকাহিনী। তাঁদের এই সাধনাকে কেউ প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখতে পারেন, কেউ কৌতূহল নিয়ে, আবার কেউবা সংশয় নিয়ে; তবে একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই:
মানুষের ভেতরের সংকল্প ও প্রতিজ্ঞার ক্ষমতা সত্যিই স্তম্ভিত করার মতো।
ইসলামী আকিদাহ: জ্বীন ও মানুষের শারীরিক সম্পর্ক ও এর প্রতিকার
ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষের মতোই জ্বীন জাতির মধ্যেও পুরুষ ও নারীর ভেদাভেদ রয়েছে। মানুষের সাথে তাদের শারীরিক সম্পর্ক বা মিলনের সম্ভাব্যতা নিয়ে উলামায়ে কেরামের মাঝে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। নিচে এর একটি তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:
১. মানুষের সাথে জ্বীনের মিলন কি সম্ভব? (আলেমদের মতামত)
এই বিষয়ে ইসলামি স্কলারদের মধ্যে মূলত দুটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়:
যাঁরা অসম্ভব মনে করেন: কিছু আলেম মনে করেন, জ্বীন ও মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি উপাদানে (আগুন ও মাটি) তৈরি এবং ভিন্ন জগতের বাসিন্দা। তাই তাদের মধ্যে এমন শারীরিক সম্পর্ক হওয়া প্রকৃতিগতভাবেই অসম্ভব।
যাঁরা সম্ভব মনে করেন (অধিকাংশের মত): জমহুর বা অধিকাংশ মুফাসসির ও ফকীহগণের মতে, জ্বীন ও মানুষের মধ্যে এই ধরনের সম্পর্ক হওয়া সম্ভব। তারা কুরআন, হাদিস এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে একে সত্য বলে গণ্য করেন।
২. কুরআন ও হাদিসের দলীল
বিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা জান্নাতের রমণীদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন:
فِيهِنَّ قَاصِرَاتُ الطَّرْفِ لَمْ يَطْمِثْهُنَّ إِنسٌ قَبْلَهُمْ وَلَا جَانٌّ
"তথায় (জান্নাতে) থাকবে আয়ত নয়না রমণীগণ, কোনো মানুষ বা জ্বীন ইতিপূর্বে যাদের ব্যবহার (স্পর্শ) করেনি।" (সূরা আর-রহমান: ৫৬)
তাফসীরকারকদের ব্যাখ্যা: ইমাম বাগাভী, ইমাম খাযেন এবং ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ.) সহ অনেক মুফাসসির এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন— আয়াতের ধরণই প্রমাণ করে যে, মানুষের মতো জ্বীনদেরও সহবাসের সক্ষমতা রয়েছে।
হাদিসের নির্দেশনা:
রাসূলুল্লাহ (সা.) স্ত্রী সহবাসের পূর্বে এই দোয়াটি পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন:
"বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা জান্নিবনিশ শায়ত্বানা ওয়া জান্নিবিশ শায়ত্বানা মা রাযাক্বতানা।" (সহীহ বুখারী)
উলামায়ে কেরামের বিশ্লেষণ: এই দোয়ার বিধান দেওয়ার অন্যতম কারণ হলো, মানুষ যাতে শয়তানের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে পারে। দোয়া না পড়লে শয়তান বা জ্বীন সেই মিলনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়।
৩. শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহ.)-এর অভিমত
বিখ্যাত সৌদি ফকীহ শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহ.) তাঁর 'লিক্বাউল বাবিল মাফতুহ' গ্রন্থে স্পষ্ট করে বলেছেন:
"আলেমগণ বলেন যে, এটি (জ্বীন-মানুষের মিলন) সম্ভব। কোনো পুরুষ জ্বীন কোনো নারীর সাথে সহবাস করতে পারে এবং নারীটি তা (জাগ্রত বা সুপ্ত অবস্থায়) অনুভবও করতে পারে।"
৪. মিলন যেভাবে ঘটে: লক্ষণ ও অবস্থা
রুকাইয়াহ (শরয়ী ঝাড়ফুঁক) বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, কোনো জ্বীন মানুষের প্রেমে পড়লে (যাকে 'জ্বীনে আশিক' বলা হয়) সে মূলত দুইভাবে ক্ষতি করার চেষ্টা করে:
ঘুমন্ত অবস্থায়: এটি সবচেয়ে বেশি ঘটে। আক্রান্ত ব্যক্তি স্বপ্নের মধ্যে তীব্র শারীরিক মিলনের অভিজ্ঞতা লাভ করেন, যা সাধারণ স্বপ্নদোষের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব মনে হয়। অনেক সময় শরীর অবশ হয়ে থাকে (যাকে সাধারণ ভাষায় বোবায় ধরা বলে) এবং কেউ পাশে আছে এমন উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।
জাগ্রত অবস্থায়: বিরল হলেও এটি ঘটে থাকে। আক্রান্ত ব্যক্তি হুট করে শরীর অবশ বা প্যারালাইজড অনুভব করেন। মিলনের সময় যৌনাঙ্গে বা শরীরে অস্বাভাবিক গরম বাতাসের মতো অনুভূতি হতে পারে, যা ব্যক্তিকে চরমভাবে দুর্বল করে দেয়।
৫. আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক লক্ষণযদি কোনো ব্যক্তি (নারী বা পুরুষ) নিয়মিত এই ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে যান, তবে তাঁর মধ্যে কিছু স্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়:লক্ষণের ধরণসুনির্দিষ্ট লক্ষণসমূহশারীরিক চিহ্নঘুম থেকে ওঠার পর শরীরে (বিশেষ করে গলা, বুক বা উরুর আশেপাশে) রহস্যময় নীল বা লালচে দাগ, খামচি বা কামড়ের চিহ্ন থাকা।তীব্র ক্লান্তিঘুম থেকে ওঠার পর প্রচণ্ড শরীর ব্যথা, অলসতা এবং চরম অবসাদ অনুভব করা।মানসিক পরিবর্তনমেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, একা থাকার প্রবণতা বৃদ্ধি, খাবারে অনিহা এবং ইবাদত-বন্দেগীতে মন না বসা।স্মৃতিশক্তি হ্রাসদিন দিন স্মরণশক্তি ও মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা দ্রুত লোপ পাওয়া।
৬. প্রতিকার ও সুরক্ষার উপায়
এই ধরনের সমস্যা থেকে বাঁচতে হলে একজন মুসলিমকে দৈনন্দিন জীবনে ইসলামি অনুশাসন ও সুন্নতি আমলের প্রতি যত্নবান হতে হবে:
নিয়মিত মাসনুন আমল: প্রতি ফরয নামাযের পর, সকালে ও সন্ধ্যায় এবং ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসী, সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাস (৩ কুল) পড়ে সমস্ত শরীরে ফুঁ দেওয়া।
ঘুমানোর পূর্বের সুন্নাত: ওজুসহকারে ঘুমানো এবং বিছানা ভালোভাবে ঝেড়ে নিয়ে শোয়ার দোয়া পাঠ করা।
গুনাহ বর্জন: ঘরকে গান-বাজনা, অশ্লীল ছবি ও বেপর্দাপনা মুক্ত রাখা, কারণ এগুলো শয়তানকে আকৃষ্ট করে।
জিকির ও নামায: পাঁচ ওয়াক্ত নামায জামায়াতের সাথে (পুরুষদের জন্য) আদায় করা এবং সবসময় ওজু অবস্থায় থাকার চেষ্টা করা।
শরয়ী রুকাইয়াহ: সমস্যা যদি প্রকট আকার ধারণ করে, তবে কোনো বেদাত বা শিরকমুক্ত, অভিজ্ঞ আলেম বা মুত্তাকী রাকী (ঝাড়ফুঁককারী) দ্বারা নিয়মিত শরয়ী রুকাইয়াহ করানো উচিত।
Install app for better experience