পটুয়াখালীর ৭ জেলে আজ থাকবেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অনুষ্ঠানে
***********************************************************************
পটুয়াখালী জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের জেলে তাঁরা। সারা রাত তাঁরা মাছ ধরেন, সারা দিন ঘুমে কেটে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনে বারবার ঠিকানা হারানো এসব জেলের জীবন কাটে ছোট পল্লিতে। কখনো নৌকায় রাত কাটিয়ে দেন। দুশ্চিন্তা আর হুমকির মুখে থাকে তাঁদের জীবন। সেই জেলেরাই এবার খুশিতে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। ডুবে আছেন ঘোরে। এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন তাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে খুব কাছ থেকে দেখবেন। তাঁরাই সেই অনুষ্ঠানের অতিথি। আজ বৃহস্পতিবার ২০২১ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার ও সম্মাননা তুলে দেওয়া হবে। সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত দর্শকের আসনে থাকবেন এসব জেলে।
বলা যায়, এ জেলেরা ২০১৭ সালে হঠাৎ করেই প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। শুটিংয়ের সময়েও তাঁরা জানতেন না তাঁদের বড় পর্দায় দেখানো হবে, তাঁদের যাপিত জীবন হয়ে উঠবে সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ‘নোনা জলের কাব্য’ সিনেমার শুটিং শেষ হয়। সেই সিনেমাটিই দেশে–বিদেশে একাধিক পুরস্কার পায়, প্রশংসা কুড়ায়। ২০২১ সালে সিনেমাটি দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। স্বীকৃতি হিসেবে সর্বাধিক ৭ শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়।
সিনেমার পরিচালক রেজওয়ান শাহরিয়ার বলেন, ‘আমরা খুবই খুশি যে সিনেমাটি সর্বাধিক শাখায় রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পেতে যাচ্ছে। সিনেমাটির জন্য আমি সেরা চলচ্চিত্র, সেরা চলচ্চিত্র পরিচালক, কাহিনিকারসহ তিনটি শাখায় পুরস্কার গ্রহণ করব। সেখানে দুটি শাখায় হয়তো আমার একক কৃতিত্ব আছে। কিন্তু সেরা সিনেমার অংশীদার এই জেলেরাও। পুরস্কার ঘোষণার পর থেকেই শুটিংয়ে জড়িত সেসব জেলের কথাই বারবার ভাবছিলাম। মন থেকে চাইছিলাম, যেভাবেই হোক এই জেলেদের জাতীয় চলচ্চিত্র অনুষ্ঠানে অতিথি করে নিয়ে আসব।’
পরিচালক রেজওয়ান শাহরিয়ার তিনটি শাখায় মনোনয়ন পাওয়ার কারণে প্রতিটি শাখার জন্য তিনটি করে আমন্ত্রণপত্র পেয়েছেন। নিজের জন্য দুটি কার্ড রেখেছেন। বাকি সাতটি কার্ডের অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য সেই গঙ্গামতির চরের জেলপল্লির অভিনয়শিল্পী কলাকুশলীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, প্রথমে তাঁরা বিশ্বাস করতে পারেননি দেশের এত বড় একটি অনুষ্ঠানের অতিথি হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করতে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘যখন ফোন দিয়ে জানালাম। শুনে তাঁরা অবাক। বিশ্বাসই করতে পারছিলেন। কারণ, এই জেলেরা কেউ কেউ আগে কখনোই ঢাকা আসেননি। কিছুই চেনেন না। কোনো আত্মীয়স্বজন নেই। তাঁরা চিন্তিত। থাকবেন কই, কোথায় খাবেন। তখন বললাম, তাঁদের সব ব্যবস্থা আমি করব। এরপরও তাঁরা কৌতূহল নিয়ে জানতে চান, সত্যি কি না।’
জীবনসংগ্রামে পিছিয়ে থাকা এসব মানুষের জীবন কাটে নানা প্রতিকূলতায়। খেয়েপরে বেঁচে থাকতে তাঁদের প্রতি মুহূর্ত সংগ্রাম করতে হয়। নানা সমস্যায় তাঁদের জীবন কাটে। সেখানে বড় একটি ঘটনা ছিল ‘নোনা জলের কাব্য’ সিনেমায় অভিনয় করা। সেই সিনেমাটি নিয়ে এত কথা হবে, এত বড় আয়োজনে অংশ হবে, সেটা কখনোই ভাবেননি এসব জেলে। তাঁদের কাছে ঢাকা চকচকে লালগালিচায় পা রাখাটা স্বপ্নের মতো ঘটনা হওয়াই স্বাভাবিক। রেজওয়ান শাহরিয়ার বলেন, ‘সিনেমাটির মধ্যে দিয়ে তাঁদের জীবনে যদি কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে, তাঁদের বাস্তুস্থান, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো নিয়ে যদি কথা হয়, তাহলেই আমার চেষ্টাটা সার্থক।’
জেলেদের মধ্যে জাতীয় চলচ্চিত্র অনুষ্ঠানে অংশ নিতে যাচ্ছেন নাসির উদ্দিন, মোহাম্মদ মুসা, জাহাঙ্গীর হোসেন, বাবুল মুনশি, রেজাউল করিম। তাঁরা কেউ মাঝি, কেউ গায়কের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। সাতজনের মধ্যে দুজন শিশু অভিনেতাও রয়েছে। এ ছাড়া আবদুর রশিদ সিনেমাটির প্রোডাকশন সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। আজিজ মাঝি সিনেমার গবেষণার কাজে জড়িত ছিলেন। মাঝিদের একজন নাসির উদ্দিনকে বেশ কয়েকবার ফোন দেওয়ার পরে পাওয়া গেল। তিনি বলেন, ‘বিশ্বাস হচ্ছে না এত বড় অনুষ্ঠানে আমরাও যাচ্ছি। ভালো লাগতেছে।’ এসব জেলে জাতীয় চলচ্চিত্র অনুষ্ঠানের এক দিন আগেই ঢাকায় এসে গেছেন।
২০২১ সালে চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদান রাখায় ২৭ ক্যাটাগরিতে ৩৪টি পুরস্কার দেওয়া হবে শিল্পীদের। এবার যৌথভাবে আজীবন সম্মাননা পেতে যাচ্ছেন ইলিয়াস কাঞ্চন ও ডলি জহুর। এবার যুগ্মভাবে সেরা চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয়েছে ‘লাল মোরগের ঝুঁটি’ ও ‘নোনা জলের কাব্য’।
Source: প্রথম আলো