সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি কিছু শিউরে ওঠার মতো ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। রাস্তায় কেউ অবশ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, কেউ অদ্ভুতভাবে সামনে ঝুঁকে আছেন, আবার কারও চোখ আধবোঁজা—যেন কোনো ‘জীবন্ত লাশ’। নেটিজেনদের দাবি, এটি নেটদুনিয়ায় বহুল আলোচিত “জম্বি ড্রাগ”-এর কারসাজি। যুক্তরাষ্ট্রে এটি “Tranq” নামে পরিচিত হলেও এর আসল রাসায়নিক নাম জাইলাজিন (Xylazine)। এটি কোনো সাধারণ মাদক নয়, বরং পশুবৈদ্যকীয় একটি ওষুধ, যা এখন মানবসমাজের জন্য এক নতুন অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাইলাজিন কী এবং কেন এটি এত মারাত্মক?
জাইলাজিন মূলত ঘোড়া বা গরুর মতো বড় প্রাণীদের শান্ত করার জন্য ব্যবহৃত একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ট্র্যাঙ্কুলাইজার বা সেডেটিভ। মানুষের শরীরে ব্যবহারের জন্য এটি কখনোই অনুমোদিত নয়।
নেশায় মিশ্রণ: সাধারণত ফেন্টানিল বা হেরোইনের মতো মারাত্মক মাদকের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী করতে অবৈধ ব্যবসায়ীরা গোপনে জাইলাজিন মিশিয়ে দেয়। অনেক সময় মাদকসেবীরা নিজেরাও জানেন না যে তারা জাইলাজিন গ্রহণ করছেন।
শারীরিক বিপর্যয়: মার্কিন স্বাস্থ্য সংস্থা CDC ও NIDA-এর মতে, এটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে শ্বাসপ্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দন বিপজ্জনকভাবে কমিয়ে দেয়, যা দ্রুত মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
ওষুধে অকার্যকর: সবচেয়ে বড় ভয়ের বিষয় হলো, সাধারণ ওপিওয়েড ওভারডোজ প্রতিরোধী জীবন রক্ষাকারী ওষুধ নালোক্সন (Narcan) জাইলাজিনের ক্ষেত্রে পুরোপুরি কাজ করে না। ফলে এর ওভারডোজ হলে রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।
কেন একে ‘জম্বি ড্রাগ’ বলা হচ্ছে?
এই মাদকের প্রভাব অত্যন্ত বিভীষিকাময়। এটি মানুষের চেতনা ও পেশির নিয়ন্ত্রণ এমনভাবে কেড়ে নেয় যা দেখলে হরর সিনেমার জম্বি মনে হয়।
স্তব্ধ আচরণ: আক্রান্ত ব্যক্তি ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই জায়গায় প্রায় অচেতন ও স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকেন।
ত্বকের পচন (Necrosis): জাইলাজিনের অন্যতম ভয়ংকর দিক হলো এটি শরীরের টিস্যু ধ্বংস করে ফেলে। ইনজেকশন বা যেকোনো উপায়ে এটি শরীরে গেলে হাত-পায়ে বড় বড় ক্ষত ও পচন ধরে। চিকিৎসা না করালে অনেক সময় আক্রান্ত অঙ্গ কেটে বাদ দিতে হয়।
আমেরিকার সংকটাপন্ন চিত্র: যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া শহরে এই মাদক "Tranq Epidemic" বা মহামারি রূপ নিয়েছে। ২০২২ সালে দেশটিতে জব্দ হওয়া ফেন্টানিল পাউডারের প্রায় ২৩ শতাংশেই জাইলাজিনের উপস্থিতি মিলেছে, যা দেখে মার্কিন সরকার এটিকে "Emerging Threat" বা উদীয়মান হুমকি হিসেবে ঘোষণা করেছে।
এশিয়ার পরিস্থিতি: ভারত ও বাংলাদেশ কি ঝুঁকিতে?
সম্প্রতি ভারতেও কিছু একই ধরনের ভিডিও ভাইরাল হওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও ল্যাব টেস্ট ছাড়া প্রতিটি ভিডিওর সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, তবুও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে আন্তর্জাতিক মাদক চক্র দক্ষিণ এশিয়াকে নতুন টার্গেট বানাতে পারে।
বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা:
বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত বড় আকারে জাইলাজিন বা জম্বি ড্রাগ ছড়িয়ে পড়ার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি। সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো ভিডিওগুলোর সব কটিই যে জাইলাজিনের কারণে—তা বলা যাবে না; কারণ তীব্র মানসিক অসুস্থতা বা অন্য কোনো মাদকের প্রভাবেও মানুষ এমন আচরণ করতে পারে। তবে ভৌগোলিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক মাদক রুট সক্রিয় থাকায় বাংলাদেশ কোনোভাবেই ঝুঁকির বাইরে নয়।
আমাদের করণীয়: এখনই প্রতিরোধের সময়
ভয়ংকর এই সিনথেটিক ড্রাগ যেন দেশের তরুণ সমাজকে গ্রাস করতে না পারে, সেজন্য এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন:
গুজব প্রতিরোধ: সামাজিক মাধ্যমে সত্যতা যাচাই না করে আতঙ্ক ছড়ানো বন্ধ করতে হবে।
কঠোর নজরদারি: সীমান্ত ও ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে পশু চিকিৎসায় ব্যবহৃত জাইলাজিনের আমদানি ও ব্যবহারে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা।
সচেতনতা বৃদ্ধি: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পরিবারে নতুন প্রজন্মের কাছে এই সিনথেটিক ড্রাগের ভয়াবহতা তুলে ধরা।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসন: মাদকাসক্তদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও সঠিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা জোরদার করা।
"জম্বি ড্রাগ" কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সংকট। বাংলাদেশে এর অনুপ্রবেশ ঠেকাতে প্রশাসন, পরিবার ও সমাজকে এখনই একযোগে সচেতন হতে হবে।